তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ওপর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র না সোভিয়েত রাশিয়ার রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক মতাদর্শগত আধিপত্য বিস্তারিত হবে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলেছে এক নিরন্তর ঠান্ডা লড়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত অনুন্নত পরিকাঠামোর রাষ্ট্রগুলিই মুখ্যত ‘তৃতীয় বিশ্ব’-র দেশ নামে পরিচিত। সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া এইসব দেশগুলিকে অর্থনৈতিক-সামরিক বা অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রথম, দ্বিতীয় বিশ্বের কোনো একটি দেশ বা তাদের অনুগামী দেশের আদর্শ ও আধিপত্যের দ্বারস্থ হতেই হত। অর্থাৎ সরাসরি রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করেও এইসব তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি কোনো না কোনোভাবে ওই দুই বিশ্বের কোনো একটির মতাদর্শ ও আধিপত্যের কাছে পরাধীন হয়ে ওঠে।

স্বাধীন হয়েও এই যে পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শাসনের মুক্তির আড়ালে পরোক্ষভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ওপর আধিপত্যগত উপনিবেশিক শাসন-কায়দার এই পুনঃপ্রতিষ্ঠাকেই বলা হলো নয় উপনিবেশবাদ। পূর্ব, পূর্ব-ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মাকর্সবাদের মতাদর্শ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ধনতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার অনুগামী দেশের কাছে এটাই ছিল ‘লাল আতঙ্ক’ বা ‘লালজুজু’। এই লাল আতঙ্ক রোধ করার জন্য তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতির নির্দেশগত নীতি ‘ট্রুম্যান নীতি’ নামে পরিচিত। কিছুদিন পরে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাতে সফল হলো তখনই তৈরি হলো আসল লড়াই। সামরিক ক্ষমতায় সোভিয়েত ইউনিয়নও হয়ে উঠল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম-ক্ষমতাবান।

কমিউনিজ‌্মের বিস্তারকে রোধ করার এই অঘোষিত যুদ্ধ যার নাম কোল্ডওয়ার, তার প্রভাব পড়তে লাগল—তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ওপর। ১৯৪৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম- ইউরোপের কয়েকটি দেশকে নিয়ে কমিউনিজ‌্মকে প্রতিরোধ করার জন্য তৈরি করল ‘ন্যাটো’ নামক একটি সামরিক জোট। ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নও কতকগুলি দেশকে নিয়ে ‘ন্যাটো’-র পালটা জবাব দিতে তৈরি করল ‘ওয়ারেশ’ চুক্তি নামক পালটা একটা জোট। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বের এই ক্ষমতাযুদ্ধের মাঝখানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ভাগ্য হয়ে উঠল সংকটগ্রস্ত।

বিশ শতকের শেষ দু-তিনটি দশকে বা একবিংশ শতকে সদ্য জন্ম পাওয়া বাংলা কবিতা বা সাহিত্যের অবস্থাও ওই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির মতো—সংকটময়।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে কেন্দ্রে রেখে যেমন ক্ষমতাযুদ্ধের লড়াই বেঁধেছিল প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বের দেশগুলির, ঠিক তেমনি, ‘ভালো’ নতুন সাহিত্য প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান বিরোধীদের মধ্যেও যেন সেই ঠান্ডা যুদ্ধ লক্ষ্য করা যায়। প্রতিষ্ঠান বিরোধীরা মূলত ‘লিটল ম্যাগাজিন’ করিয়ে হিসেবেই সাধারণভাবে পরিচিত। একজন কবির বা লেখকের লেখা প্রকাশের মাধ্যম হয় সাধারণত লিটল ম্যাগাজিনই। তা ছাড়া কবিতা-চরিত্রের যা কিছু নতুনত্ব তাকে লিটল ম্যাগাজিনই প্রতিষ্ঠা দেয়।

দু-দশটা লিটল ম্যাগাজিনে লেখা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হওয়ায় মোটামুটি ভাবে যখন একজন লেখক পাঠক মহলে পরিচিতি লাভ করেন, তখন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক স্বার্থে সেই লেখক-প্রতিভার সামনে খুলে দেয়—মুখরোচক দিশার সন্ধান। তাঁরা ধীরে ধীরে সরতে থাকেন, লিটল ম্যাগাজিনের অনিশ্চয়তার জগৎ থেকে। গ্ল্যামার-সর্বস্ব নানাবিধ পুরস্কার, আর্থিক নিশ্চয়তার কাছে লেখক-প্রতিভাকে সমর্পণ করেন।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান একজন লেখককে তৈরি করে না—সে হুকুম করে। লেখক হয়ে পড়েন কেরানি-কলমচি, সাংবাদিক। লিটল ম্যাগাজিনের কিন্তু সেরকম কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকে না। বুদ্ধদেব বসুর কথাতেই বলতে হয় [বুদ্ধদেব বসু, ‘সাহিত্যপত্র’, ‘দেশ’, বর্ষ ২০, সংখ্যা ২৮, ২৬ বৈশাখ ১৩৬০, ৯ মে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ]: “লিটল ম্যাগাজিন ব্যবসা হিসেবে অচল, তাকে চালাতে হ’লে আর্থিক অপব্যায়েরও শক্তি চাই। সেটা শুধু ধনের শক্তি নয়, মনেরও শক্তি,…” ‘এবং মুশায়েরা’ পত্রিকার সম্পাদক সুবল সামন্ত সেই ধারাবাহিকতায় বলেন, “…বাণিজ্যিক সাফল্যের সম্ভাবনা রয়েছে ভেবে লিটল ম্যাগাজিন পত্রিকা প্রকাশে উদ্যোগী হয় না।…বাজারের কথা ভেবে লিটল ম্যাগাজিনের বিষয় নির্বাচিত হয় না। হওয়া উচিত নয়। তার কাজ অন্ধকার দিক আলোকিত করা। পাঠক কোন সংখ্যা কিভাবে গ্রহণ করবে তা তার নিজস্ব ব্যাপার। পত্রিকার বিশেষত্ব তার অভিনবত্বে। সে যদি নতুন কিছু না দেয় তা হলে তার আবির্ভাব ব্যর্থ।” (“‘এবং মুশায়েরা’ প্রসঙ্গে দু-চার কথা”, ‘জ্বলদর্চি’, ১৭ বর্ষ, ১-৪ সংখ্যা, জানুয়ারি-ডিসেম্বর ২০০৯, পৃ. ৫২-৫৩)।

আমরা জানি, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক কাগজের মুখ্য উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন। লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে এখানেই তার পার্থক্য। মৌলিক বিষয় এবং সাহিত্যরীতিকে মাপকাঠি ধরলে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত এমন বেশ কিছু বেশ লিটল ম্যাগাজিনের ঘোষিত ও অঘোষিত প্রতিষ্ঠান বিরোধী চলন লক্ষ্য করা যায়। এই রকমই একটি ঘোষিত প্রতিষ্ঠান বিরোধী লিটল ম্যাগাজিন—‘উত্তর পর্ব এই বিষ’। ‘উত্তর পর্ব এই বিষ’-এর ১৮ অগ্রহায়ণ, ২য় বর্ষ ১৪০০ সংখ্যার প্রচ্ছদে লেখা ছিল: ১. একমাত্র প্রতিষ্ঠান বিরোধীরাই জীবিত ও সৃষ্টিশীল। ২. সমস্তরকম তথাকথিত বাজার চলতি ক্লাউন কালচারের বিরুদ্ধে বা বাণিজ্যিক সাহিত্যের কোনও পরিপূরক নয়, সমান্তরাল। সবরকম স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে বিপ্লবাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহসই মূলধন।

‘ভালো’ লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে একদিকে থাকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অভাবনীয় প্রস্তাব, আরেক দিকে থাকে এতদিনকার সম্পর্ক-লালিত্যের লিটল ম্যাগাজিনের ‘প্রতি-বাৎসল্য’র প্রত্যাশা। খ্যাতিমান লেখকের মানস-চৈতন্যের কাছে এ যেন এক দারুণ সংকট। সেভাবেই কোনো কোনো লেখক প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার—যৌথ দাবিকে ভারসাম্য দিতে চেয়েছেন। কিছু নাম অনায়াসে করে ফেলা যায় এমন। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই দুটি বিপরীত কথা আমরা শুনি: বাংলা ভাষায় এমন বহু ‘কালজয়ী’ সাহিত্য-সৃষ্টি হয়েছে যা প্রতিষ্ঠানের আদেশ তামিল করা। দ্বিতীয়ত প্রতিষ্ঠিত লেখকের লেখা প্রকাশ করে লিটল ম্যাগাজিনের নিজেদের ‘গৌরব’ বৃদ্ধি ও বাণিজ্য-সম্ভাবনার হিসেব কষা।

এসব পুরাতন তর্ককে পাশে নিয়েই যে বিষয়টায় নজর দেওয়া যায় তা হলো—কে লিখছেন, কী লিখছেন এবং কোথায় লিখছেন। দুয়েকটি ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে যাঁর খারাপ লেখার, তিনি স্ব-গুণেই খারাপ লেখেন। যিনি ভালো লিখতে স্বচেষ্ট তিনি সাধারণত চেষ্টা করেন ভালো লিখতে। আপাত-সরলীকরণ মনে হলেও এ কথাকে অস্বীকার করার উপায় বিশেষ নেই। আর যিনি নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে সচেতন তাঁর লেখা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিন—যেখানেই প্রকাশ হোক না কেন—সে লেখকের ‘ভালো’ লেখার কৃতিত্বর ‘পালক’ সম্পাদকের বা প্রকাশকের শিরস্ত্রাণে জোড়ার নয়। যদি না তেমন সন্ধানী, বিচক্ষণ কেউ সম্পাদক হিসাবে তার দায় পালন করে। যিনি লেখকের সঙ্গে সংলাপে রত হন লেখা নিয়ে। কে সম্পাদক, কেমন সম্পাদক এ বিষয়ে নতুন করে আর কিছু বলার নেই। দুনিয়ার তাবড় নাম বহু আলোচনায় আলোচিত। সম্পাদক তথা প্রকাশক সংশয় প্রকাশ করে বাতিল করেছেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রসিদ্ধ হওয়া বহু লেখকের/ লেখার কথা আমরা জেনেছি। প্রাবন্ধিক পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় সখেদে বলেছিলেন, ‘আমার লেখার ভালো খারাপ নিয়ে দু-একজন ছাড়া প্রায় কেউই কোনো কথা বলেন না, কারণ তাঁরা পত্রিকাটাই প্রকাশ করে থাকেন, পড়াশুনো করেন না।’

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক-দেড় দশকে গ্রন্থ বিশেষত কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে দু-একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নামই উঠে আসত। বিদ্যাচর্চার তেমন সম্প্রসারণ না ঘটার কারণে, ছাপাখানার মতো প্রযুক্তি না থাকার কারণে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের তেমন পরিধি বিস্তার। ঘটেনি সুদূর জেলার গ্রাম-মফস‌্সলের দিকে। আজ পরিস্থিতি অনেক বদলালেও, রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে শহর কলকাতামুখী হতে হয় লিটল ম্যাগাজিন করিয়ে সম্পাদক ও প্রকাশকদের।

কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে সিগনেট প্রেসের কথা সর্বাগ্রে উল্লিখিত হত। পাশাপাশি ডি. এম. লাইব্রেরি, বেঙ্গল, এম. সি. সরকার-ও ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে তারা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে সিগনেটের মতো অতটা খ্যাতিসম্পন্ন ছিল না। তখনকার দিনে সিগনেট থেকে কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ কবিকে দিত কৌলীন্যের আইডেনটিটি। সিগনেট-এর তকমা লাগলেই কোনো কবির কাব্যগ্রন্থের কবিতা ধারে ও ভারে কেটে যেত। কিন্তু সিগনেট-এর এই বিপুল ‘আগ্রাসন ও আভিজাত্য’ ধীরে ধীরে আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড-এর সামনে জৌলুস হারাতে লাগল।


২.

সময়ের পরিবর্তনকে অস্বীকার করা প্রায় অসম্ভব। ব্যক্তির চাওয়া না-চাওয়া তাকে ঠেকাতে পারে না। এই পালটে যাওয়া সময়কে বুঝতে আমরা বরং একটি ‘স্মৃতিগদ্য’ পড়ি :

তো, পড়তি রোগভোগে, বা আত্মহননের শ্লথ পরিণতিতে ‘অমি প্রেস’ উঠে গেল, বিনাশ অনিবার্যই ছিল। তবু শেষ মুহূর্তে, বিমল করের গল্পের অনন্ত নৈয়ায়িকের মতো, বিনাশমান ওই জগৎ ও জীবনটির প্রতি আবেগে বিহ্বল হলাম: সব যেন হারিয়ে যাচ্ছে, অতল এক শূন্যতার গহ্বর-মুখে আমি। আমার সামনে শববাহকের মতো চারজন কালোয়ার, চেক-লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরনে, লোমশ হাতে কালান্তকের মতো তারা খালি কেস থেকে ব়্যাক থেকে ক্ষিপ্র হাতে কেস আর গালিগুলো টেনে টেনে বার করছে। উলটে দিচ্ছে মেঝেতে, খটখট ঝুরঝুর টাইপ পড়ছে, ধুলোর ঘন কুণ্ডলী, ভ্যাপসা গন্ধ। নিষ্ঠুর সেই শব্দের ধ্বনিময়তায়, অনুচ্চ গোঙানির মধ্যে স্তূপীকৃত হচ্ছে ওদের সওদা করা টাইপ। নিশ্চল সিসের টাইপগুলো এই মুহূর্তে কক্ষচ্যুত, পরিচয়হীন—কয়েকটি তো কৌমার্য নিয়ে এখনও চকচক করছে। এই টাইপ-ও আমার অস্তিত্ব—স্মৃতির সরু পথ ধরে বিশটি বছর দ্রুত পেরিয়ে যাই।

এই টাইপগুলো ছিল সজীব অক্ষর; ক’দিন আগে পর্যন্ত এই অক্ষরগুলো সারিবদ্ধ হয়ে বাঙ্ময় করেছে কত কথা ও অনুভব—মেহনতি মানুষের শোষণ-বঞ্চনার কথা, বন্ধ কারখানার গেটে অবস্থানরত শ্রমিকদের লড়াইয়ের কথা, ভূমিহীন কৃষকের দুর্দশার কথা, আরওয়ালের বা ভাগলপুরের বর্বরতার কথা; আবার সেই অক্ষরগুলো ভিন্ন বিন্যাসে মূর্ত করেছে কবির বোধ ও অনুভব, গল্পকারের বিষয়চেতনা ও অভিজ্ঞান। অথচ ওরা এখন কক্ষচ্যুত সিসের ধাতুমাত্র। সেই স্তূপীকৃত মৃত অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি; যেন চিনতে পারি প্রত্যেককে, ওদের গায়ের তেলকালির আস্তরণ ও আঁশটে গন্ধ ওরা যেন পূর্ববৎ রয়েছে ওদের চারশ চৌষট্টি ঘরে—মৃণাল-রবি-পণ্ডিতের আঙুলের মৃদু টানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পিতলের স্টিকের ওপর, কটিভাঁজে ওদের কোমল বৃদ্ধাঙ্গুলি।…না, ওরা আর নড়বে না, কোনো এক রূপে পুনর্জাত হবার প্রতীক্ষায় ওরা এখন সিসে মাত্র। শেষকৃত্য চলতে থাকে: বস্তায় পোরা, ওজন করা, হিসাব-নিকাশ—আমি নিষ্পলক তাকিয়ে থাকি একত্রিশটি বস্তার দিকে।

একসময় সব ফঁকা হয়ে যায়, বিষণ্ণ কর্মীরা এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে, স্যাঁতাপড়া দেয়াল, দেয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডার, বারান্দায় বন্ধুদের টুকরো কথা। কে যেন এক ভাঁড় চা বাড়িয়ে দেয়।…তারপর দিন যায়, রাত কাটে না; নিধুম মধ্যরাতে কে যেন সিঁড়ি ভেঙে উপরে ওঠে, চেনা স্বরে ডাকে—নীচতলা থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে ওঠে—কারো হাসির দমক, কারো কঠিন উচ্চারণ;…অতীতের অনুষঙ্গে নিজের ওঠানামা, অসংখ্য মুখের ভিড়ে কিছু কিছু মুখ, স্মৃতি সত্তা ছাপিয়ে দুটি অস্থির দশক বাজায় হয়ে ওঠে। একটি অতিক্ষুদ্র প্রেস কীভাবে একটি স্যালোঁতে পরিণত হলো এবং কাদের নিয়ে তার গঠন, তা বলা শক্ত। বিশাল এই কলকাতা মহানগরীতে একটি ক্ষুদ্র ছাপাখানা কীভাবে প্রতিষ্ঠা পেল, বহু বিদ্বজ্জনের সমাবেশ ঘটল সেখানে—সেটা এক হেঁয়ালি।

বিশ বছর ধরে ধীরে ধীরে বিস্তার, আবার একই সঙ্গে তার আত্মবিনাশী রোগের সংক্রমণ—সমগ্র প্রক্রিয়াটিই রহস্যময়। তবে বলা যায়, বহু গুণীজনের আগমনে যেদিন প্রেসটি একটি বৌদ্ধিক সমাবেশ পরিণত হলো সেদিন থেকেই প্রেসটির চরিত্রে গুণগত পরিবর্তন ঘটল, লক্ষ্মী রেগেমেগে চলে গেলেন; অভাব অনটন বা সাদা কথায় দারিদ্র্য দেখা দিল, প্রেসটা আর চলতে পারল না, উঠে গেল। এর জন্য হা-হুতাশ নেই, আবার আত্ম-আক্রমণের উচ্চনাদ অতিকথনও নেই।

নকশালবাড়ি আন্দোলনের অন্তিমপর্বে কলকাতার বাতাসে তখন বাবুদের গন্ধ, জনজীবনে সন্ত্রাস। বোমাবাজি, খুনোখুনি, গুলি, কারফিউ, কম্বিং সমানে চলছে—ওপার থেকে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ইয়াহিয়ার বর্বর অত্যাচারে ঘরবাড়ি ছেড়ে এসেছে এ বাংলায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে—আওয়ামি লিগের দেশত্যাগী নেতারা সব মধ্য-কলকাতার হোটেলগুলোতে জম্পেস দিন কাটাচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের যুবসমাজ কিন্তু মতাদর্শগত বৰ্গীকরণে বিন্যস্ত; প্রতিষ্ঠিত কবি জেরবার বিপ্লবী তরুণ সাহিত্যকর্মীর প্রশ্নে: ‘কেন লেখেন? কার জন্যে কবিতা লেখেন?’ আমার ছোটভাই কমল তখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে—শিল্পউন্মাদনায় মেতে আছে। সমসময়ের বিপ্লবী জাগরণ থেকে দূরে, শিল্পচর্চার এক বিশেষ পরিমণ্ডলে তার তখন যথেষ্ট পরিচিতি; এবং সেই সূত্রেই একদিন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে নিয়ে সে প্রেসে এল, ‘ঈথার দুহিতা’ ছেপে প্রকাশ করতে। অলোকরঞ্জনবাবু শুধু প্রথমদিনই আমার সঙ্গে আলাপ করলেন, তারপর আর আমাকে প্রয়োজন হয়নি, সরাসরি ঢুকে যেতেন কম্পোজ-ঘরে। সে-ঘরটার ছাউনি অ্যাসবেস্টারের, চারটে দেয়ালই ভিজে, নীচে জলের ট্যাঙ্ক—জানালা খোলা হয় না। মেয়েরা উঠোনে স্নান করে।

আলোকরঞ্জনবাবু সেই ঘরে একটা টুলে বসে থাকতেন প্রায় গোটা দিন, অসীম-অনন্ত তাঁকে সামনে বসিয়েই তাঁর কবিতা কম্পোজ করত, আর বকবক গল্প তো চলতই। কীভাবে কথালাপ জানি না, আমি তো তাঁর রক্ষাবরণ তখন ভেদ করতে পারিনি! এবং আশ্চর্য, মুদ্ৰক হিসেবে অসীমের নামটা তিনিই দিলেন। অসম দুই ব্যক্তিত্বের এই অন্তরঙ্গতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম সেদিন, তারপর কিন্তু আর তিনি প্রেসে আসেননি বা চিঠিও দেননি কাউকে। অসীম একদিন সংকোচের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘অলোকদা কি আপনাকে চিঠি লেখেন?’

অনুজ কমলের সূত্রে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঝাঁক ছেলেমেয়ে এসে প্রেসে কলরব তুলল, সঙ্গে দলনেতা পঙ্কজ সাহা—কলাবিভাগের পত্রিকা ছাপা হবে। প্রেসের তখন সবে শৈশব, টাইপপত্র তেমন নেই, অথচ ওদের অন্তহীন বায়নাক্কা—বর্জেস চাই, বর্জেস বোল্ড হলে আরও ভালো; বলে যাচ্ছে ফ্লাই-লিফে ডবল ইম্প্রেশন, সেন্টার কম্পোজ, ব্লক ছাপা হবে স্লেট-গ্রেতে…। নতুন প্রেস করেছি, নিজেই ছাই সব জানি না, তো ওদের কথাই শুধু শুনি। টাইপ কেনার জন্য এক হাজার টাকা দিল—হাজার টাকার তখন অনেক দাম। টাইপ কিনে ওদের সহযোগিতায় এবং মেশিনম্যান আবুর নিষ্ঠায় পত্রিকাটি যখন ছেপে বেরুল সত্যি অবাক হয়ে গেলাম আমিও।

পঙ্কজ সাহা দূরত্ব রেখে চলতেন, আমিও। ক’দিন বাদেই শুনলাম, পঙ্কজ সাহা যুববাণী-র কর্ণধার হয়েছেন; ভিতরে ধাক্কা লাগল: বিক্ষুব্ধ যুবশক্তিকে আত্মসর্বস্ব চেতনায়, কলাকৈবল্যবাদে ও উচ্চাভিলাষপুরাণে আকৃষ্ট করার সচতুর এই সরকারি প্রকল্পটির ভূমিকা তো কারো অবিদিত নয়!

যে কমলের উদ্যোগে প্রেস প্রতিষ্ঠা, এবং সামান্য হলেও সাফল্য তার কবিতার প্রথম গ্রন্থটি ছাপার আয়োজন হলো। সে কী উত্তেজনা! কম্পোজ করছে অসীম আর ছোট অনন্ত, মেকআপ করছেন রঞ্জনদা—নির্দেশক কমল ও বাণীব্রত। প্রচ্ছদ ও অলংকরণের সব দায়িত্ব আমার শ্যালক বাণীব্রতর—সে তখন সরকারি আর্ট কলেজের ছাত্র। কম্পোজ-ঘরের বাইরে একটা লম্বা বেঞ্চি—পালা করে সেখানে বসছে, কাত হচ্ছে কমল আর বাণী। সাতসকাল থেকে রাত অবধি—প্রেস-বাড়ির বাসিন্দারা খেঁকিয়ে না ওঠা পর্যন্ত আবু মেশিন চালায়। কমল ঘুরঘুর করে, সিগারেট ফোঁকে—আমি দর্শক মাত্র। ‘মেঘ ময়ূর ও অন্যান্য’ গ্রন্থকারে বেরুলে হইচই পড়ে গেল—দারুণ প্রোডাকশন!

কবিদের আগমন রাতারাতি বেড়ে গেল বহুগুণ। লিটল ম্যাগাজিন এল একগাদা। বাংলা সাহিত্যের নবীন কবি-লেখক-কর্মীদের সঙ্গে সেই যে পরিচয় ঘটল তা কখন যে ঘনিষ্ঠতর হয়ে গেল তা বুঝতেও পারিনি।

ফুল ফুটুক নিয়ে পার্থ বন্দোপাধ্যায়, সঙ্গে কুটুসও, এসেছিল সত্তরের প্রথমে, আর বেরুল প্রেস উঠে-যাবার দিন। প্রেসের সঙ্গে সেঁটেই গিয়েছিলেন পার্থ। প্রতিটি বিপর্যয়ে পার্থ পাশে ছিলেন, বন্ধু বলতে যা বোঝায়। গরচার ডানপিটে যুবক কীভাবে যে ‘বিপ্লবী কবি’ হয়ে উঠলেন! তবে, স্বভাবে সেই পুরোনো তেজটা ছিলই। ‘কেন প্রুফ হয়নি? আমরা কি পয়সা দিই না? কলকাতায় কি আর প্রেস নেই?’ চিৎকার চেঁচামেচি করে বেরিয়ে গেলেন পার্থ, কেউ থামাতে পারল না। দীপক হাসছে, ‘আসবে’; সজল বলল, ‘বিপ্লবী কবি তো!’ ক’দিন বাদেই আবার পার্থ এলেন, কিছুই ঘটেনি যেন, ভাঁড়ে চা খাওয়া, চুটিয়ে আড্ডা। রাজনীতি ও সাহিত্য—দুইয়ের টানাপোড়েন এর মধ্যে প্রথম থেকেই ছিল।

‘ম্যানিফেস্টো’, ‘অন্বেষণ’ আর এখন ‘পর্বান্তর’ পত্রিকার সম্পাদক পার্থ-র প্রথম কবিতার বই ‘পোস্টার অথবা কবিতা’, দ্বিতীয় কাব্যসংকলন ‘কাকেরা আশ্চর্য পাখি’ ছেপে ওর অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিদান দিতে খানিক চেষ্টা করেছিলাম—কিছু দিয়েই ওঁর অবদান শোধ করা যায় না। পার্থর সঙ্গে প্রেসে আসতেন ওঁর বন্ধুরা; সনৎ দাশগুপ্তের ‘ইস্পাতের পাতে মরচে ধরে না’ তখন খুব সমাদৃত হয়েছিল; এছাড়া আসতেন গৌতম ঘোষ, রাজা মিত্র, রাজা চ্যাটার্জী, জগন্নাথ গুহ, শাহযাদ ফিরদাউস প্রমুখ চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকাররা। এর মধ্যে রাজা চ্যাটার্জী ছিলেন একটি কিংবদন্তী চরিত্র। একটি গ্যারেজে শয়ন ও যত্রতত্র ভক্ষণ। পেশা বলতে কিছু নেই, নেশা বলতে সব আছে। পরনে জিনসের প্যান্ট, উনিশ শতকীয় পাঞ্জাবী, চোখে রোল্ড গোল্ডের চশমা, কাঁধের ঝোলাব্যগে বিশ্বসাহিত্যের দুর্লভ বেশ কিছু গ্রন্থ নিয়ে গৌরবর্ণ সুদর্শন রাজা যখন তখন চলে আসতেন প্রেসে। আড্ডা দিতেন ঘন্টার পর ঘন্টা—এজরা পাউন্ড-এলিয়ট, বিষ্ণু দে-সুধীন্দ্রনাথ, চেখভ-দস্তয়েভস্কি, কাফকা-ক্যামু…।

ছাপার কাজ নিয়ে রাজা একবারই এসেছিলেন, সে-ও এক কাণ্ড। মি. রাও বলে কোনো এক ভদ্রলোক বার্লিনের প্রাচীর নিয়ে একটি ইংরেজি কাব্য রচনা করেছেন, রাজার ওপর দায়িত্ব সেটা মুদ্রণের। পাণ্ডুলিপি দেখে আমি বিস্মিত: He/ wants/to escape… এক একটি শব্দে এক একটি লাইন; মৃণাল একদিনেই তিন ফর্মার বইটি কম্পোজ করে ফেলল। মেশিন-ঘরে রাজা ছাপা দেখছেন; একদিন দুপুরে ‘আমার He কোথায় গেল?’ চিৎকার করতে করতে ছুটে এলেন উপরে, সঙ্গে পাড়ার কৌতূহলী একদল ছেলে। পিছনে আবু মাথা চুলকোচ্ছে; আমি হেসে বললাম, এসে যাবে। He-টা ছাপতে ছাপতে পড়ে গিয়েছিল, আবু আবার ছেপে দিতেই মুখে ফুটে উঠল হাসি তারপর প্রবল অট্টহাস্য।

পার্থই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রথমে প্রেসে নিয়ে আসেন। আর তাঁর আসা মানেই সেঁটে যাওয়া, প্রত্যেককে জয় করে নেওয়া। অতবড় কবি—কিন্তু কী সরল সহজ। একেবারে আটপৌড়ে মানুষ। মানবিক গুণাবলি যা আমরা এখন হারিয়ে ফেলেছি—তার প্রকাশ দেখেছি তার মধ্যে। ‘ব্রহ্মজনের পদাবলী’ সম্পাদনা করেছেন, ভূমিকা লিখেছেন; তো আমাকে বললেন: ভুল থাকলে দেইখ্যা দিয়েন। আজও সেই স্বরটি আমার একান্ত সম্মাননা। তাঁর ফোল্ডারগুলের বেশিরভাগই আমাদের ছাপা। প্রথমবার নিয়েছিলাম—একশ ত্রিশ টাকা। সেদিন থেকে পরের পাঁচ বছর একশ ত্রিশটি টাকা ও কবিতাগুলো রেখে দিয়ে তিনি চলে যেতেন; কম্পোজ, প্রুফ দেখা, সাজানো, রং নির্বাচন সব দায়িত্ব আমার। কাগজের মূল্যবৃদ্ধি, ছাপার খরচ বাড়ার সঙ্গে বা আমার স্বেচ্ছা শ্রমদানের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এটা যেন ছিল স্বাভাবিক কর্তব্য। বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন স্টলে বা কলেজ স্ট্রিটে দেখা হলেই দুই হাতে জড়িয়ে ধরতেন; সেই স্পর্শময়তায় জীবনটাই নতুন খাতে বয়।

গৌতম ও ভারতী ‘কল্পক’ পত্রিকা ছাপতে প্রেসে আসত, কমলও সঙ্গে ছিল। ভারতী একদিন ওঁর বাবা নাট্যকার বাদল সরকারের ‘কবি কাহিনী’ নাটকটি ছাপতে দিল। বাদল সরকার তখন সাংস্কৃতিক জগতে এক বিশেষ নাম। উনি এলেন ফাইনাল প্রুফ দেখতে। কম্পোজ-ঘরের টুলে বসে পড়তেই আমি একটু অস্বস্তি বোধ করলাম, একটা চেয়ার আনার কথা বলায়, উনি সহাস্যে বললেন, প্রেস মানেই তো টুল, ছায়ান্ধকার, ভ্যাপসা গন্ধ, মুড়ি-তেলেভাজা, আর ঘন ঘন ভাঁড়ে চা!

সংসদীয় গণতন্ত্র ও ভোটসর্বস্ব রাজনীতিকে নিয়ে তাঁর সেদিনের বিদ্রুপ কি আজও প্রাসঙ্গিক নয়? আবার গৌতম নিয়ে এসেছিল, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তখন তিনি স্কটিশের অধ্যাপক। কৃশকায় স্বল্পবাক ভদ্রলোকটির কবিতার বই ছাপা হবে, কমল প্রচ্ছদ করবে। অসাধারণ প্রোডাকশন চাই। ‘মূৰ্ছিত কুয়াশা’ ছাপা হলো চারশ কপি; রঞ্জনবাবু পাঁচ কপি বই নিয়ে চলে গেলেন, আর দেখা নেই। তিনশো পঁচানব্বই কপি বাঁধাই বই আগলে আমি বসে আছি, বছর গড়ায়। কমল একদিন জানাল, কোনো এক বিশেষ ক্ষেত্রে কাব্যপ্রতিভা প্রদর্শনের জন্যেই ওই বইপ্রকাশ—সেটা মিটে গেছে।

আমহার্স্ট স্ট্রিট আর মহাত্মা গান্ধী রোডের মোড়ে বাটার দোকানের গা-ঘেঁষে পটলডাঙায় ঢুকলে এক-মানুষ সাইজের একটা চিপে গলি, গলির মধ্যে টেনিদার রকটা, সেটা পেরিয়ে গেলে ডানে বঙ্গবাসী প্রেস, তার সামনে গোবিন্দের চায়ের দোকান, নন্দর মুদিখানা, আর একটু এগোলে বাঁয়ে পঁয়তাল্লিশ নম্বর, তার সামনেটা পুলিশের গুলির ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত, ডানে ফণির বাইন্ডিংখানা, এবার বাঁ-দিকের প্যাসেজ ধরে ঢুকে গেলে সাতচল্লিশ, পাশেই জোড়াবাড়ি, তার প্রথম সিঁড়িটা বাদ দিয়ে ছায়ান্ধকার চাতাল পেরিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে দ্বিতীয় সিঁড়ি, উপরে উঠুন—এই পথনির্দেশ নিয়েই একদিন শঙ্খ ঘোষ উপরে উঠে এলেন। ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত ক্ষীণকায় অধ্যাপক কবির সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়।

‘কমল আমাকে আজ আসতে বলেছিল, আমি শঙ্খ’—আমি তখন গেঞ্জি গায়ে কম্পোজ করছি, সলজ্জভাবে জানালাম, প্রুফ হয়নি। উনি হাসলেন মৃদু, যেমন হাসেন। ‘ছন্দের বারান্দা’ মুদ্রণ ও প্রকাশনা উপলক্ষে এরপর তিনি বহুবার প্রেসে এলেন; মুদ্রণের খুঁটিনাটি কৃৎকৌশল, প্রুফ দেখা ওঁর কাছ থেকে কম শিখিনি। সেই যে প্রথম আলাপ তা বহু ঘটনার মধ্য দিয়ে গাঢ় হয়েছে। বিশেষ একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে; ‘কলকাতা২০০০’ পত্রিকায় প্রকাশিতব্য তাঁর প্রবন্ধ ‘বিশেষণে সবিশেষ’-এর জন্য তিনি তিনবার প্রেসে এসেছিলেন, অধ্যাপক চিত্ত ঘোষকে দু-বার পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কেন? আমার ধারণা, শঙ্খদার আশঙ্কা ছিল যে, সম্পাদক জ্যোতির্ময় দত্ত হয়তো কাটছাঁট করবে তাঁর রচনার। বোধ-অনুভব, অভিমান-ক্ষোভ নিষিক্ত প্রত্যাঘাতমূলক ওই আবেগী রচনাটি মানুষ-শঙ্খ ঘোষের এক আদর্শ পরিচয়। যে-কোনো লেখারই প্রুফ দেখতে নিজে চলে আসতেন, তবে সাধারণত প্রেসের আড্ডায় বসতেন না; তাও বসলেন একদিন এবং কেন, ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের এত বিক্রি জিজ্ঞেস করতেই, উনি সেই হাসি হাসিমুখে বললেন, ‘ইতিহাস-বই ভেবে লোকে কিনে ঠকছে!’

‘সন্ধিক্ষণ’ পত্রিকার সঙ্গে প্রেস ও ব্যক্তি আমার সেঁটে যাওয়ার পরিণতিতে রাজনৈতিক পত্রপত্রিকা, প্রগতিশীল সাহিত্যপত্র ইস্তাহার ও লিফলেট মুদ্রণের কেন্দ্র হয়ে উঠল আমাদের ছাপাখানাটি। আরএসপি-র ছাত্র সংগঠনের মুখপত্র ছাপতে আসতেন ক্ষিতি গোস্বামী, অশোক ঘোষ; তাঁদের ব্রেক-অ্যাওয়ে গ্রুপ ‘সন্ধিক্ষণ’ আসতেই তাঁদের যাতায়াত কমে গেল। তবে ক্ষিতি গোস্বামী যে-কোনো জরুরি কাজেই চলে আসতেন, এবং ওঁরা পরস্পর এক জায়গায় বসে আড্ডাও দিতেন। তারপর এল বিপ্লবী কমিউনিস্ট সংগঠনগুলো; প্রথমে ভাস্কর নন্দী, সন্তোষ রাণা, তারপর আইপিএফ, তারপর ছোট বড় নানা গোষ্ঠী, এবং শেষে এলেন অসীম চট্টোপাধ্যায়, তাঁর ‘সাম্যবাদী পথ’ ছাপাতে। শুধু এঁরাই নন, এঁদের সঙ্গে এল যাদবপুর-প্রেসিডেন্সি-গুরুদাস কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ছাত্র সংগঠন—উজ্জ্বল কিছু তরুণ প্রতিভা। মতাদর্শগত ভিন্নতা ও বিরোধ থাকা সত্ত্বেও প্রেসের আডডায় সবাই অংশ গ্রহণ করতেন; হাসি-ঠাট্টা, কখনও সিরিয়াস প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা চলত, ঘনঘন চা আসত, মুড়ি-বাদাম বা মুড়ি-তেলেভাজা যোগে টিফিনও হত একসঙ্গে। ভাস্কর নন্দী প্রথম প্রথম একটু আড়ষ্ট ছিলেন, পরে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলেন; অসীম চট্টোপাধ্যায় আর তখন কাকা নন, একেবারে, প্রাণবন্ত মানুষ। তো এই সমাবেশটি ঘিরে পুলিশমহলে সন্দেহ ও নজরদারিও ছিল যথেষ্ট; মাঝে মাঝেই আইবি থেকে লোক আসতেন সন্ধ্যার পর, খোঁজখবর নিতেন।

দীপক রায় ‘সন্ধিক্ষণ’-এর এডিটোরিয়াল লিখছেন, সজল-পার্থ-শ্যামল-অতনু বা সন্দীপ-বন্যা-রাখা-বিপুল এবং চেয়ারচ্যুত আমি বারান্দার বেঞ্চিতে বাসে বা রেলিঙে হেলান দিয়ে শরৎচন্দ্রের পথের দাবী—রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাস বা দস্তয়েভস্কি-চেখভ-টলস্টয়, কাফকা-কামু কিংবা অমিয়ভূষণের গদ্যরীতি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকে চলেছি, চা খাচ্ছি; ওখান থেকে কখন যে বাংলা কবিতার বর্তমান ধারায় পৌঁছে যাই টের পাই না। নতুন লোক এলে তাঁকে দলভুক্ত করতে বেশি সময় লাগত না; ফলে দ্বিপ্রহারিক বা সান্ধ্য এই আসরে প্রতিদিন সদস্য বাড়তে লাগল। পুষ্কর দাশগুপ্ত আমাদের শোনাতেন ফরাসি সাহিত্যের কথা, সজল ছিল প্রাচীন সাহিত্যের স্মৃতিধর পাঠক—দুজনে প্রায়ই দ্বন্দ্বে দ্বৈরথে নেমে পড়তেন, আমরা ঋজু হতাম, উপভোগ করতাম।

পুষ্কর দাশগুপ্তর সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গিগত ভিন্নতা থাকলেও, মানুষ হিসেবে তাঁকে আমি অনেক উদার দেখেছি। ‘কনফ্লুয়েন্স’ নামক একটি বাংলা-ফরাসি দ্বিভাষিক পত্রিকা ছাপতে তিনি প্রেসে এসেছিলেন মধ্য-সত্তরের কালো দিনগুলোতে। ফরাসি সাইন টাইপ তাঁর অনুরোধে কেনা হলো। তারপরই আলিয়াস ফ্রঁসে থেকে একটা বড় বরাত: শানু লাহিড়ি চিত্রিত এবং পুষ্কর দাশগুপ্ত সম্পাদিত বিশ শতকের ফরাসি কবিতা—আটজন কবির সুমুদ্রিত এই সংকলনটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠক কর্তৃক সমাদৃত হয়েছিল মাত্র নয় প্রেসের সুনামও বৃদ্ধি পেয়েছিল।

ফরাসি সাহেবরা এলেন প্রেসটি দেখতে, আর দেখে তো বিস্ময়ে হতবাক, এ কী! একালেও এই সাবেকি কারিগরি ব্যবস্থায় মুদ্রণ! ক্লাশ সিক্স-সেভেনে পড়া কম্পোজিটররা হাতে কম্পোজ করছে, নিতাইবাবু মেকআপ করছেন, আবু বা কানাই নস্কর ছাপছে।…আবার ম্যাক্সমুলার থেকে নীহার ভট্টাচার্য এসে কেনালেন জর্মান সাইন টাইপ। জর্মান কাজ খুব বেশি আসেনি, তবে ত্ৰি-ভাষায় ফোল্ডার ছাপার জন্যে অনেকেই এসেছেন।

একদিন রাজা মিত্রের পরিচয়ে আনন্দকুমার এসে ছাপতে দিলেন—একটা তথ্যচিত্রের ফোল্ডার: কলকাতার টানা রিকশা নিয়ে তোলা ছবি ‘ম্যান ভার্সেস ম্যান’-এর। ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রতিযোগিতায় তথ্যচিত্রটি প্রথম পুরস্কার পেল—আমাদের সে কী আনন্দ!

বইমেলায় সাহিত্য পত্রিকা ও কবিতার বই, পুজোতে বহু পত্রিকার শারদীয় সংখ্যা আর রাজনৈতিক বুলেটিন-লিফলেট ছাপা যেমন ছিল তেমনি সারা বছর ধরে ছিল নিয়মিত কিছু কাজ। কাজ নেই—অবস্থাটি তেমন ছিল না, টাকা নেই অবস্থাটিই নিত্যসঙ্গী— প্রেসের চাকা বনবন ঘুরছে, কেটলি ভর্তি চা আসছে, অথচ অভাব যাচ্ছে না। সেই অভাব মেটাতে দিলীপ চৌধুরী নামক এক রহস্যময় ব্যক্তি এক রোমাঞ্চকর কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছিলেন; কীভাবে যেন নিয়ে এলেন কংগ্রেসের গুয়াহাটি এআইসিসি অধিবেশনের অংশ-বরাত। সেও কী কম টাকার। তাঁর যা হবার হলো—কাজ তুলে দিয়ে প্রেস কিছু পেল না। একবার মরিয়া হয়ে ভোটার লিস্ট ছাপার কাজ নিয়ে লাভের মধ্যে বাংলা কেসগুলো ‘পুং’-স্ত্রী’ সমভিব্যাহারে একেবারে ‘পাই’ হয়ে গেল। বার কয়েক জব কাজ, কালার ছাপার কাজ করবারও প্রস্তুতি নিয়ে বেশ কিছু টাকা দেনা হলো ব্যাংকে, আর কিছু হলো না। কেন যেন অক্ষরবৃত্তে মগ্ন থাকতেই ভালো লাগত…।

ছোট একটি ছাপাখানা সত্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নব্বইয়ের উঠে গেল—তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বৌদ্ধিক বৈঠক। রতন খাসনবিশ, কৌশিক ব্যানার্জী, অলোক মুখোপাধ্যায়, অরুণ বসু, তুষার রায়, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, নিশীথ ভড়, অনুরাধা মহাপাত্র, ‘চার নম্বর ফার্নেস চাজর্ড’-এর কবি কমল চক্রবর্তী, নির্মল হালদারের হুটহাট চলে আসা, ‘শতভিষা’র মৃণাল দত্ত—এঁদের সঙ্গেই বিশ বছরের গেরস্থালি। ‘সত্তরের যিশু’ ছাপাতে পুরুলিয়া থেকে প্রেসে এলেন, সৈকত রক্ষিত, সারাদিন বসে থাকেন, আড্ডায় অংশ নেন, প্রেসের ঠিকানায় ওঁর চিঠি আসে, তারপর একদিন প্রেস ডিঙিয়ে বাড়িতে। ‘অগ্রণী’ ছাপাতে এলেন অমল চক্রবর্তী, শক্তি মুখোপাধ্যায়, প্রীতি চক্রবর্তী; এঁদের সঙ্গদোষেই অক্ষরবৃত্তের প্রতি টান—সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে নিজেকে নতুন করে খোঁজা। সেই খোঁজার প্রক্রিয়ায় হারাতে হয় প্রেসটি।…

পালটে যাওয়া এই সময়ের স্মৃতিচারণ করেছেন, পৃথ্বীশ সাহা। এই স্মৃতিগদ্যটির ভূমিকা এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বলা চলে। বঙ্গীয় জীবনযাপনে এসে লাগতে শুরু করেছে সে সময় বিশ্বায়নের হাওয়া। বদলে গেল খুব দ্রুত মুদ্রণ-প্রকৌশল।


৩.

গ্ল্যামারাস এবং কোয়ালিটিটিভ—বাজার অর্থনীতিকে করায়ত্ত করার ফলে, সবদিক থেকেই আনন্দ-র এই একমেবাদ্বিতীয়ম‌্ ‘আগ্রাসন’ সিগনেটের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলল আর (বর্তমানে তো সিগনেট আনন্দ-র সঙ্গেই মিশে গেছে) আনন্দ-র শিখায় সেদিন পতঙ্গের মতো ‘পরিচিত’ লিটল ম্যাগাজিনের কবি-লেখকদের ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রয়াস লক্ষ্য করা গেল।

বড় প্রকাশকরা সবাই কম-বেশি শ্রেষ্ঠ বা নির্বাচিত শিরোনামে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেও, কবিরা এক্ষেত্রে এখনও নির্ভর করেন মূলত ছোট পত্রিকার প্রকাশনার উপর। আবার কোনো কোনো পত্রিকা, পত্রিকা প্রকাশের বদলে পুরোপুরি প্রকাশনা-ব্যাবসাতেই মনোনিবেশ করেছে এমন অনেক উদাহরণও আমরা গত এক-দেড় দশকে দেখেছি।

ছায়া প্রকাশনী (পশ্চিম দিনাজপুর), সিন্ধুসারস (হাওড়া), বাক‌্চর্চা (বর্ধমান), কেতকী (পুরুলিয়া), শব্দদিগন্ত (কোচবিহার), নালন্দা (বাঁকুড়া), সোপান প্রকাশনী (বাঁকুড়া), ইস্পাতের চিঠি (বর্ধমান), আকাশ প্রকাশনী (মুর্শিদাবাদ), স্বর্ণাক্ষর (হাওড়া), অনুক্ষণ (নদিয়া) এগুলি মুখ্যত লিটল ম্যাগাজিনের নামে অভিহিত, প্রকাশনা দপ্তর নয়। কোনো কোনোটি আবার মূলত প্রকাশনা হয়েও বিশেষ কোনো লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত। অল্প কয়েকটিকে বাদ দিলে এইসব অধিকাংশ প্রকাশনা দপ্তরের গ্রন্থ প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য স্বাভাবিক ভাবেই বাণিজ্য। যদিও বড় প্রকাশনীর চমকের কাছে, অনেক সময়েই তারা নিষ্প্রভ।

অবশ্য এক্ষেত্রে ‘কবিতা’ (১৯৩৫) পত্রিকার ‘কবিতাভবন’ প্রকাশনা দপ্তরই এদের পথ-প্রদর্শক। সাহিত্য লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হবে, না কি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থে প্রকাশ করা হবে—এ নিয়ে আর কোনো দ্বন্দ্বের সংকট থাকল না ‘প্রতিষ্ঠিত’ লেখকের মানস-চৈতন্যে। কারণ লিটল ম্যাগাজিনের নাম কেন্দ্রিক প্রকাশনা দপ্তরে গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তাঁরা যেমন পেতে পারেন খ্যাতি, বিজ্ঞাপন ও পুরস্কার; তেমনই এক্ষেত্রে তারা লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভিত্তিভূমির কাছেও দায়বদ্ধতা জ্ঞাপন করতে পারেন।

লিটল ম্যাগাজিন কেন্দ্রিক প্রকাশনা দপ্তর না থাকলে, ‘স্বনাম-খ্যাত লেখক’রা বোধহয় ওই দ্বন্দ্বের সংকট থেকে অল্পে মুক্তি পেতেন না। অখ্যাত ও বিখ্যাতকে পরস্পরের নিকটে এনেছে—এ জাতীয় প্রকাশন সংস্থা। কলকাতাসহ জেলার বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের নাম-কেন্দ্রিক প্রকাশনা দপ্তরের মধ্যে কোনো কোনো লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলত তাদের প্রকাশনা দপ্তরও বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেলেও তারা রেখে গেছে তাদের প্রচেষ্টার স্বাক্ষর।

‘অনুষ্টুপ’, ‘এবং মুশায়েরা’ মূলত লিটল ম্যাগাজিন হলেও তাদের প্রকাশনা দপ্তর প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। ‘এবং মুশায়েরা’ প্রকাশনা দপ্তর থেকে লোকনাথ ভট্টাচার্যের কবিতা, উজ্জ্বলকুমার মজুমদারের ‘কবিতার মুখোমুখি’, বীতশোক ভট্টচার্যের কবিতা সংগ্রহ, তপোধীর ভট্টাচার্যের সুধীন্দ্রনাথ: ভাববিশ্ব ও কাব্যবীক্ষা, অনিতা অগ্নিহোত্রীর কবিতা সমগ্র, বীতশোক ভট্টাচার্য ও সুবল সামন্তের যৌথ সম্পাদনায় ‘নীটশে’, সুবল সামন্ত সম্পাদিত ‘বাংলা কবিতা: সৃষ্টি ও স্রষ্টা’ এছাড়া কিয়ের্কেগার্দ, জাঁ পল সার্ত্র, সিমন দ্যা বোভেয়ার-এর মতো বিশেষ সংখ্যার/গ্রন্থের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়। যদিও স্বল্প সংখ্যক পাঠকই এখনও এসব বইয়ের কথা জানেন। আমরা উল্লেখ করতে পারি ‘অবভাস’ বা ‘ভাষালিপি’ কিংবা ‘আদম’, ‘তবুও প্রয়াস’, ‘রাবণ’, ‘আলো পৃথিবী’ প্রভৃতি প্রকাশনীর।

‘কবিতা ক্যাম্পাস’-এর প্রকাশনা দপ্তর থেকে প্রকাশিত হয়েছে, রতন দাসের ‘কাকতাড়ুয়ার গান’, ধীমান চক্রবর্তীর ‘দস্তানা ভরে উঠেছে’, অলোক বিশ্বাসের ‘নীল আয়নার লাল ঘোড়া’, ‘মাকড়সার জাল’, প্রণব পালের ‘ম্যাজিক ক্যানভাস’, স্বপন রায়ের ‘লেনিন নগরী’, পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের ‘আরোগ্যভূমির দিকে’র মতো কাব্যগ্রন্থ।

সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন, ‘কবিতা পাক্ষিক’ পত্রিকার কাণ্ডারী প্রভাত চৌধুরী। সে প্রকাশনা দপ্তর থেকে প্রকাশিত প্রভাত চৌধুরী-র ‘প্রভাত চৌধুরী’, রাজকল্যাণ চেলের ‘তৈরী হচ্ছে পাহাড়’, ‘মৃদু লাঠি চার্জ’। সৈয়দ খালেদ নৌমান ও সন্দীপ বিশ্বাসের সম্পাদনায় ‘কবিতা মুর্শিদাবাদ’-এর মতো কাব্যগ্রন্থ। ‘মহাদিগন্ত’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে, দীপক হালদারের ‘মগ্ন শিকড়ে একা’, উত্তম দাশের ‘লৌকিক অলৌকিক’, মৃত্যুঞ্জয় সেনের ‘ঐতিহাসিক কণ্ঠস্বর পরেশ মণ্ডলের ‘পেন্ডুলাম’, মতি মুখোপাধ্যায়ের ‘আমার সৈন্য হবে নতুন পতাকা’র মত কাব্যগ্রন্থ। বলাবাহুল্য এখানে উদ্দেশ্য কোনো গ্রন্থনামের তালিকা নির্মাণ করা নয়। বরং প্রকাশনা-’ব্যাবসা’র সমান্তরাল যে প্রবাহ তাকে বুঝে নিতে চাওয়া।

লিটল ম্যাগাজিন বলতে আমরা মূলত কবিতা-র কথাই প্রথমে ধরে নিই। লিটল ম্যাগাজিন কেন্দ্রিক এইসব প্রকাশনা দপ্তর থেকে প্রকাশিত গ্রন্থগুলির কবিতা অনেকক্ষেত্রে পত্রিকার চরিত্রধর্মকেই বহন করে। যেমন: কৌরব। এইসব প্রকাশনা দপ্তর না থাকলে, লিটল ম্যাগাজিনগুলির চরিত্রধর্ম তাদের পত্রিকার পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যেত।

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাদের (লেখক) এই চরিত্রকে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে পরিচিতি দিতে কখনই সাহায্য করত না। কারণ প্রতিষ্ঠান সাধারণত চায় নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যের সাহিত্য। অতএব এ কথা না বললেও চলে যে, বাংলা সাহিত্যর মৌলিক প্রচেষ্টার পরিচিতি সংরক্ষণে লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশনা দপ্তরগুলি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান বিরোধী ‘ঠান্ডাযুদ্ধ’য় যেভাবে বাংলা সাহিত্যের অবস্থা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ভবিতব্যের মতো সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়ছিল, তাকে সেখান থেকে কিছুটা হলেও রেহাই দিয়েছে লিটল ম্যাগাজিনের এইসব প্রকাশনা দপ্তরগুলি।




প্রচ্ছদচিত্র সৌজন্য: www.getbengal.com