আমার সাবেকি বিহনন


১.

আমাকে গিলে নাও যতদূর খুশি, নীরব হেরে যাওয়া বলে দিয়ে যাক এ বছরের বসন্ত। তোমার ভেতরে তুমি, তারও ভেতরে এক অন্য তুমি হেঁটে বেড়াও মাতাল হরিণের ছানার মতো। আমি তোমাকে ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি এটা বলে দেবার পর। তোমার ভালোবাসা হঠাৎই কমতে থাকে কমতে কমতে একসময় মরাদিঘির পাঁক দেখা যায়। যে টলটলে বিকৃত দিঘির ওপরে একসময় চন্দ্রভুক খেলা করত, সে দিঘির দেবতা আমার স্বপ্নে আসে আমার ওপর তাচ্ছিল্য করে হাসতে থাকে। আমি বৈশাখের দুপুরের মতো নিঃসঙ্গ হতে থাকি। পাহাড় নদী আকাশ জঙ্গল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চোখ বন্ধ করে ঘুরে আসি। মাকড়সার রস পান করার মতো বেদনাদায়ক নেশাদ্রব্য খুঁজে নিতে দ্বিধা হয় না। তারপর, তারপরে একটা রাস্তার গরম হওয়ার ছোঁয়ায়, গলে পরা আলকাতরার উপর আটকে পড়া মাছি দেখে তোমার কথা মনে পড়ে। শরীরে আঁশটেনি গন্ধ উপভোগ করি। আমার ওই মাছিটার ওপরে বীভৎস মায়া ঠিক যেরকম দেখেছিলাম তোমার কালো হরিণ চোখে…



২.

অথচ তোমায় নিয়ে আমার কোনো সাধারণ প্রশ্ন ছিল না। রোদ বাড়ছে রোদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সংশয়। এইসব সংশয় মূল্যহীন ভাবে আলো করে রাখে জীবন। ভেবে দেখেছ তোমার আমার এই দুঃসংবাদ মানুষ মেনে নিয়েছে। জলপ্রপাতের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে অন্ধকার ছেয়ে যাচ্ছে আমাদের মাথার চারপাশে। রহস্যময় ভাবে জানতে পেরেছি তোমার স্বামী আমার খবর নেয়। ছারপোকার মতো গুটিকয়েক কবিতা লিখতে পেরেছি আর পেরেছি তোমাকে ভুলে যেতে। আমি তোমায় আর ভালোবাসি না। এই সহজ কথাটি মেনে নিতে আমার চল্লিশতম জন্মদিন পালন করতে হলো…



৩.

আমি প্রতি রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি। আর নাছোড়বান্দা ভাবে জাগিয়ে তোলে তোমায় নিয়ে দেখা অযোগ্য সব স্বপ্ন। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি। নাকি ফুটপাতের কোনো ভিখারির মতো নিজেকে তৈরি করে নেবো একদিন। খিদেহীন দামি সখ‌ আল্লাদহীন। না কি ভেজাল কিছু ধর্মীয় উপাসক হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি ধীরে ধীরে অজান্তেই।

তোমাকে ভুলে যেতে যেতে আমার শরীরে তোমার নামের গুপ্ত জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের জন্য আমার বড্ড দুশ্চিন্তা হয়। ইদানীং দেখি তুমি নেচেকুঁদে ভালোই আছো। অথচ তোমার ভালো থাকা দেখাটা, আমার কাছে বিদেশী নামের কোনো ব্যাধির মতো কাজ করে। তবে এত তাড়াতাড়ি আমার মৃত্যু হবার কথা না। আমি তো চেয়েছিলাম তুমি ভালো থাক আজও এটাই চাই। আমাদের এক পরিপক্ক সংসার হবার কথা ছিল। শহরের ধার ঘেঁষে একটা বাড়ি। বাড়ি মধ্যে দু-খানা বড় ব্যালকনি। ঘটনাচক্রে সে সব ভেস্তে গেলেও এখনও মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি সেই বাড়ি আর বাড়ির রং তোমার পছন্দমতো। বারান্দায় তোমার স্বামী বসে খবরের কাগজ উলটায় আর জোরে জোরে পড়ে শোনায় আমার অপকর্মের কথা। পাঁচ বছরের একটি শিশু খেলে বেড়ায় তোমার সাধের বাগান ঘিরে। এটাই তো চেয়েছিলাম আমি। যদিও এসব আমি স্বপ্নে দেখি…



৪.

কী অস্বাচ্ছন্দ্য ঘিরে ধরেছে। নীল আলো ঠিকরে পড়ছে চোখের উপরে নাইটল্যাম্প থেকে। এই নিখিল বিষের মতো আলোকরশ্মি ঘিরে আমার অসাড় অ-মৃত শরীরটি নীল হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে একা আমি সেই ত্রিমাত্রিক যোগ করে ফেলেছি। তুমি আমি এবং তোমার স্বামী। এসব নিয়ে ভাবার কথাই ছিল না কোনোদিন। কথা ছিল বাহুল্যমান তেল চ্যাটচ্যাটে বাংলা কবিতাকে আত্মসাৎ করে নেবার। অথচ এইসব উত্তেজনার কয়েকশো মাইল দূরে তুমি বসবাস করবে। আমি গর্ভধারিণী ধানের শীষ কেটে ফেলব করাতের মতো দাঁত দিয়ে…



৫.

আমাকে ভেঙে গড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে চলে গেলে। আমার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্বপ্নগুলো এখন একা একাই বাঁচে। দহনমূলক যে ক-টা কবিতা লিখেছিলাম তুমি চলে যেতে। এখন বড্ড বোকা বোকা লাগে। এভারেস্টের পাদদেশের শীতল আবহাওয়া যেমন এক টুকরো রোদ ভালোবাসে, দুটি গাছ যেরকম ভাবে নিজেদের সুখ-দুঃখ নিস্তব্ধ শব্দ দিয়ে আদানপ্রদান করে। তোমার সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা এমন। ভালো আছ কি খারাপ আছ এখন কিছুই জানার অধিকার নেই। শুধু তুমিও বেঁচে আছ কিছু লেগে থাকে সম্পর্কের দল বলে দিয়ে যায় বারেবারে। এখানে একটা মজার বিষয় হলো প্রতিবার তোমাকে ভুলে যাবার যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাই। তাতে নিমিষেই জল ঢেলে দিয়ে যায় আমাদের ঘিরে থাকা পরিচয়টা। আমার এই সাবেকি বিহননতায় তারস্বরে হেসে ওঠে সকলে। সকাল বেলার আকাশ দেখলে মনে হয় শুধুই শূন্য, কিন্তু কে জানে কত নক্ষত্রের প্রজন্ম লুকিয়ে আছে আমাদেরই মতো।



৬.

সবে হিম হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ তোমার কথা ভাবলেই গায়ে আঁচড় কেটে যায় স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা বাতাস। মেকি নৈতিক সন্ধ্যা ড্যাব ড্যাব করে দেখে। ঘরের প্রদীপ পুড়ে যাবার গন্ধ আসে নাকে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। কয়েকটা কবিতা লেখা শেষ না করতেই বিকেল গড়িয়ে আসে। সারা দুপুর ধরে আমি শুধু তোমাকে ভেবেছি। বেশিরভাগই নষ্ট করেছি বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ।

তোমাকে নষ্ট মেয়েছেলে বলব কী! বলে হয়তো কিছুটা মনে মনে গরম উত্তেজনা গড়ে উঠে। না। ঠাকুরঘর থেকে অনবরত ভেসে আসছে ঈশ্বরীয় সংলগ্ন ধ্বনি। সেই ধ্বনি আমার নষ্ট মানসিকতার শুদ্ধিকরণ করে দেবে হয়তো। আমি নিজেকে আর দোষ দিই না। এমনকি তোমাকেও না। কেনই বা দিতে যাব। যে যার জায়গায় সব ঠিক। একটি ধারা আরেকটি ধারাকে সোজাসুজি ভাবে স্পর্শ করছে না। আলুলায়িতভাবে বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। মাটির সোঁদা গন্ধে নেশা। আমি আমার কবিতার সমস্ত ব্যাকারণ মিলিয়ে নিচ্ছি। চারিদিকটা একটা ঘন ঠান্ডা নিস্তব্ধতায় ঘিরে ধরছে। অব্যাকরণীয় কবিতা একটি একটি করে ছিঁড়ে পুড়িয়ে দিচ্ছি আর আগুনের নাড়ি ধরে শব্দের চিৎকার ভেসে যাচ্ছে ওই বৃষ্টির মধ্যে। আমি এমনই একা। উদাহরণ স্বরূপ চলন্তিকা ও একটি ভাঙা শব্দার্থ…



৭.

নির্বাচিত কয়েকটি কথা তোমার জন্য, এই যে এত কবিতা এত ভাষা এত এত শব্দ তোমায় ঘিরে এসব মিথ্যা মনে হয় আজকাল। মায়ের মুখ দেখলে খুব কান্না পায়, তিনি চেয়েছিলেন এই জগতের আমি একজন নির্বাচিত পুরুষ হই যেন। কাল রাতে যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম, তাতে আমার এই পাথরসম দেহটি কয়েকটা ছায়ামানুষ তুলে নিয়ে দৌড়োচ্ছে রুদ্ধশ্বাসে আর ভোরের শিশির বিন্দু গিলে নিচ্ছে এক এক করে। অযথা তোমার স্মৃতির কবরখানায় ঘোরাঘুরি করতে করতে নষ্ট করে ফেললাম এতগুলো কবিতা। অন্ধকারে হারিয়ে যাই চোখে আলো জ্বলে আর বুকের ভেতর কালো পাথরের মৃত উপত্যকা জমে। ছেঁড়া মশারির নীচে স্বপ্ন দেখি রোজ। আর একটা জন্ম হলে হোক তা শুধু কবিতার জন্য। এসব কবিতা টবিতা লিখে আমার দ্বারা এ জন্মে কোনোদিনই কোনো কিছু হত না। সত্যি বলতে তুমি আমার পাশে দাঁড়িয়ে যেটুকু সময় বেঁধে দিয়েছিলে ওইটুকু সময় শুধু মনে রাখার কথা ছিল।




প্রচ্ছদচিত্র সৌজন্য: www.pinterest.com


Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *